WHAT'S NEW?
Loading...

৫ লাখ শিশু মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেয়া হল যে কারনে

ছবি : রওয়ান ৩২ বছর বয়সে দেখা হয় মায়ের সাথে


 


মেহেদী হাসান



লরনার বয়স তখন ২৩। তার কোলে ছয় সপ্তাহের ফুটফুটে একটা মেয়ে শিশু। লরনাই শিশুটির মা। কিন্তু ছোট্ট এ শিশুটিকে লরনার কাছ থেকে জো

র করে কেড়ে নেয়া হল চিরদিনের জন্য। কারণ লরনা বিবাহিতা নয়। লরনার চেয়ে ১১ বছরের বড় এক শিক্ষকের সাথে বিয়েবহির্ভূত গোপন প্রণয়ের ফসল লরনার কোলের শিশুটি। লরনার ছয় সপ্তাহ বয়সী শিশুটির নাম রওয়ান। রওয়ানের মত ৫ লাখ শিশুকে তাদের মায়ের কোল থেকে জোর করে কেড়ে নেয়া হয়েছে। কারণ তাদের মায়েরা বিবাহিতা নয়।



এ ঘটনা যুক্তরাজ্যের। যুক্তরাজ্যের সমাজে তখন বিয়েবহির্ভূত সন্তানকে খুবই অপমানজনক কলঙ্কিত বিষয় হিসেবে দেখা হত। ধর্ম, পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্র এ ধরনের মায়েদের তখন মা হিসেবে স্বীকৃতি দিতনা। তাই এ ধরনের সন্তান হলে মাকে বাধ্য করা হত অন্য কারো কাছে তাকে দত্তক হিসেবে তুলে দিতে। নিজের সন্তান অন্যের কাছে তুলে দিয়েই পার পেতনা এসব মায়েরা। একেবারে কাগজে কলমে লিখে দিতে হত যে, সে কোন সন্তানের মা নয় বা দত্তক দেয়া সন্তান তার নয়। এমনকি এসব মা যাতে তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে না পারে সেজন্য ইনজেকশন দিয়ে তাদের বুকের দুধ উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়া হত। জন্মের পর সন্তানকে মায়ের কোলে পর্যন্ত দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়। সন্তান দত্তক দেয়ার পর সে সন্তানের সাথে যোগাযোগ করা বা তার পরিচয় প্রকাশ করাও তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল ।
বিয়ে ছাড়া যেসব ম

েয়ে সন্তান জন্ম দিত তাদের পরিবারও তাদের গ্রহণ করতনা। সামজতো নয়ই। তাদের কেউ বাড়িভাড়া পর্যন্ত দিতনা। সমাজে এসব মা তখন মুখ দেখাতে পারতনা। গঞ্জনায় ছারখার হত তারা। কেউ তাদেরকে মায়ের স্বীকৃতি দিতনা।



১৯৫০ থেকে ৮০’র দশক পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে এভাবে মায়ের কোল থেকে ৫ লাখ সন্তান বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু যুক্তরাজ্যের সমাজ এখন আমুল বদলেছে। এখন কোন মা বিয়ে ছাড়া সন্তান জন্ম দিলে তাকে কোন পারিবারিক সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় কলঙ্ক বহন করতে হয়না। তাই বর্তমান যুক্তরাজ্যের অনেকে সেসময়কার মায়েদের প্রতি যে আচরন করা হয়েছে সেজন্য দু:খ প্রকাশ করছে। সেসময়কার অনেক মা রাষ্ট্রকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছে তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতার জন্য। তাদের কোল থেকে তাদের সন্তান কেড়ে নেয়ার জন্য।



লরনার কোল থেকে রওয়ানকে কেড়ে নেয়া বিষয়ে তিনি জানান, রওয়ানকে শেষ দেখার দৃশ্যটি আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। নিল চোখ, সোনালী চুল। তার শরীরে তোয়ালে পেচানো। অসহায় এ শিশুটিকে আমার সামনে তুলে দেয়া হল আরেকজনের কাছে। আমাকে কাগজে সই দিয়ে মাতৃত্ব অস্বীকার করতে হল।



লরনা বলেন, এর থেকে কখনো একটি দিনের জন্যও আমি তাকে ভুলিনি। মেটারনিটি হোমে শিশুটি যখন জন্ম নিল তখন নানরা আমাকে বলল, তাকে দুধ খাওয়ানো যাবেনা, ভালও বাসা যাবেনা। তারা আমার মেয়েকে আমার কোলেও দেয়নি একবারও। তারপর তারা জানাল শিশুটিকে দত্তক দেয়া হবে।  শিশুটিকে অন্যের হাতে তুলে দেয়ার পর সেদিন আমি বাসস্টপে আসি এবং সেখানে বসে অনেক কেঁদেছি। আজো আমার মনে হয় আমার শরীরে একটি অংশ আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।



শিশুটির বয়স যখন আট মাস তখনে তার একটি ছবি আমার কাছে পাঠাল কেউ একজন কোন পরিচয় উল্লেখ না করে। ওই ছবি ছাড়া তার আর কোন কিছু আমার কাছে নেই।



লরনার বয়স এখন ৬৯। তিনি পশ্চিম লন্ডনে থাকেন। এরপর তিনি আর কখনো বিয়ে করেননি এবং কোন সন্তানও হয়নি তার।
লরনার মত আরো লক্ষ লক্ষ মায়ের মধ্যে আরেকজন হল ভিরোনিকা স্মিথ। ভিরোনিকা ছিল পশ্চিম সাসেক্সের একজন নার্স। তার বয়স যখন ২৪ তখন সে বিয়েবহির্ভূত অবস্থায় গর্ভবতী হয়। সেটা ১৯৬৫ সালের কথা। সন্তান জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যে ভিরোনিকার কোল থেকে তাকে কেড়ে নেয়া হয়। ভিরোনিকা স্মিথের বাবা ছিলেন একজন লে. কর্ণেল। তিনি একজন গোড়া ক্যাথলিক। ভিরোনিকা স্মিথের মা এবং বোন তার এ ধরনের সন্তান জন্ম দেয়ার কথা জানলেও তার বাবাকে কখনো এ ঘটনা বলার সাহস পায়নি কেউ।



ভিরোনিকা বলেন, তার বড় বোন এবং মা এ ঘটনা জানার পর তারা বলল, বাবাকে এটা কখনোই বলা যাবেনা। অপমানে সে হয়ত মারা পড়বে।



ভিরোনিকা বলেন, আমার তখন মনে হয়েছে আমি যদি কাউকে খুন করতাম সেটা হয়ত তারা মানত। কিন্তু বিয়ে ছাড়া আমার সন্তান হওয়ার বিষয়টি তাদের কাছে ছিল এতটাই ঘৃন্য। ক্যাথলিক চার্চের দৃষ্টিতে আমি এতবড় পাপ করেছি যে, আমি কখনো স্বর্গে যেতে পারবনা।



ভিরোনিকা জানান, গর্ভবতী হবার পর সে তার বয়ফ্রেন্ড স্যামকে বিষয়টি জানাল। স্যাম তাকে পরামর্শ দিল গরম জলে গোসল করা এবং জিন পান করার। সে তা করল কিন্তু তাতে তার গর্ভ নষ্ট হলনা। এরপর সে তার বড়বোনকে চিঠি লিখে জানায়। বড়বোন তাকে দক্ষিণ লন্ডনে একটি ক্যাথলিক সংশোধনাগারে পাঠাল যেখানে তার মত আরো অনেক মেয়ে আছে। সেটা ছিল এক ধরনের কনভেন্ট যেখানে খুব কঠোর নিয়ম কানুন মানা হত। এখানে থাকা অবস্থায় তার মা এবং বোন তার বাবাকে বলত আমি বিদেশে গিয়েছি চাকরি করতে। তার মা তার সাথে মাঝে মাঝে দেখা করত।



১৯৬৫ সালের ২ মার্চ ভিরোনিকার সন্তানের জন্ম হয়। সন্তান জন্মের পর ইনজেকশন দিয়ে ভিরোনিকার বুকে দুধ উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হল। ভিরোনিকা বলেন, আমি তাকে এনজেল ডাকতাম। সে ছিল পটে আকা ছবির মত সুন্দর।



ভিরোনিকা জানান, পিতা ছাড়া সন্তান নিয়ে কোথাও গিয়ে দাড়াবার কোন জায়গা আমার হয়নি। আমার বাবার বাড়িতে ছয়টি বেডরুম রয়েছে। কিন্তু আমি জানতাম সেখানেও আমার আশ্রয় হবেনা। তাই আমি বাধ্য হয়ে আমার সন্তানকে দত্তক দিলাম আর এরপর পরিবারে ফিরে গেলাম। তারা আমাকে বলল আমার সন্তানের কথা যেন আমি আর মনে না রাখি।



ভিরোনিকা বলেন, এরপর আমার জীবন চুরি হয়ে গেল। আমি সব ভুলে থাকার জন্য আমার নার্সিং পেশায় পূর্ণ মনোযোগ দিলাম।
ভিরোনিকার সন্তানের কথা কোনদিন না জেনেই তার সামরিক কর্মকর্তা পিতা মারা যায়। গত ৩০ বছর ধরে ভিরোনিকা তার কোল থেকে সন্তান কেড়ে নেয়ার ভার বহন করে চলছে। এর মধ্যে ভিরোনিকা আর কাউকে বিয়ে করেনি। শেষ হয়ে গেছে তার সন্তান উৎপাদনের পর্যায়। এরপর একেবারেই ভেঙ্গে পড়ে ভিরোনিকা।



একদিন সে তার অফিসের বসকে জানাল তার একটি মেয়ে রয়েছে। এরপর ভিরোনিকা আবার নতুন করে বাঁচার জন্য লন্ডন থেকে পূর্ব সাসেক্সে চলে যায়। সেখানে রজার নামে একজন বিপত্নীকের সাথে তার পরিচয় হয়। তার এক ছেলে এবং দুই মেয়ে। ভিরোনিকাও তাকে হেসে জানায় তারও একটি মেয়ে আছে। পরিবারের সদস্য ছাড়া রজার হল দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি যাকে সে তার সন্তানের কথা বলল । এরপর রজারকে বিয়ে করে সে তার নি:সঙ্গ জীবনের ইতি টানার জন্য।



এরই মধ্যে ভিরোনিকা জানতে পারে তার মেয়েটি দত্তক মা-বাবার সাথে কানাডায় বাস করছে এবং সেও মা হতে চলেছে। ভিরোনিকা তার মেয়ে ক্যাথরিন এবং নাতির সাথে একসাথে দেখা করে।



মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া শিশুদের সাথে মায়েদের মিলনের জন্য লন্ডনে একটি সংস্থা কাজ করছে। তাদের প্রচেষ্টায় ভিরোনিকার মত লরনাও ২০০৫ সালে তার মেয়ের দেখা পায়। সে একটি সরকারি চাকরি করে।



লরনার মত লক্ষ লক্ষ মেয়েকে শুধু তাদের পরিবারই ত্যাগ করেনি বরং গর্ভধারনের পর তাদের প্রেমিকরাও তাদের কোন খোঁজ নেয়নি। লরনা জানান, তার শিক্ষক তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল। এরপর তারা একসাথে বসবাস শুরু করে। গর্ভধারনের তিন মাসের মাথায় তাকে সে ছুড়ে ফেলে এবং আরেকজন মেয়ে জোগাড় করে।



২০১১ সাল থেকে ভিরোনিকা আন্দোলন করে আসছে যুক্তরাজ্য সরকারকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য। সরকার যদি ক্ষমা চায় তবে তাদের ব্যথা কিছুটা লাঘব হবে এ আশা ভিরোনিকার।



যুক্তরাজ্যের বর্তমান সমাজে বিবাহবর্হিভুত সর্ম্পক ও সন্তান জন্মদানকে আগের মতো অপরাধ হিসাবে দেখা না হলেও সমাজে এর বহুমাত্রিক অভিঘাত রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রেমিক-প্রেমিকার সর্ম্পক স্থায়ী হয় না। একাকি জীবন যাপন করতে হয়। আর শিশুর জন্ম হলেও এক ধরনের নি:সঙ্গতা কাজ করছে। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল হিসাবে পারিবারিক বন্ধন ভেঙ্গে যেতে থাকে।
সূত্র : ডেইলিমেল।


 

0 comments:

Post a Comment